কিসমিস আমাদের পরিচিত একটি শুকনো ফল, যা আঙুর শুকিয়ে তৈরি করা হয়। ছোট আকারের এই
মিষ্টি খাবারটি দেখতে সাধারণ হলেও এতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান।
কিসমিসে খাদ্যআঁশ, প্রাকৃতিক চিনি, পটাশিয়াম, আয়রন এবং বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। তাই পরিমিত পরিমাণে কিসমিস খেলে এটি দৈনন্দিন
স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার একটি অংশ হতে পারে।
অনেকেই সকালে খালি পেটে পানিতে ভিজিয়ে কিসমিস খান। আবার কেউ নাশতা, দুধ, ওটস বা
বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে কিসমিস যোগ করেন। তবে কিসমিস খাওয়ার উপকারিতা পেতে হলে
শুধু কখন খাচ্ছেন সেটিই নয়, কতটুকু খাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রতিবেদনে জানব কিসমিস খাওয়ার উপকারিতা, সকালে ভিজিয়ে কিসমিস খাওয়ার বিষয়টি,
প্রতিদিন কতটুকু কিসমিস খাওয়া যেতে পারে এবং কারা কিসমিস খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক
থাকবেন।
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃশরীরে দ্রুত শক্তি জোগাতে সাহায্য করেঃ
কিসমিসে প্রাকৃতিক চিনি ও কার্বোহাইড্রেট থাকার কারণে এটি শরীরের জন্য দ্রুত
শক্তির উৎস হতে পারে। যারা দিনের শুরুতে ব্যস্ত থাকেন বা শারীরিক পরিশ্রম করেন,
তারা পরিমিত পরিমাণ কিসমিস নাশতার সঙ্গে খেতে পারেন।তবে কিসমিসে প্রাকৃতিক চিনি ও
ক্যালরি তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়।
কিসমিসে থাকা খাদ্যআঁশ হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান এবং অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে কিসমিস খেলে দৈনন্দিন
খাদ্যতালিকায় ভালো পরিমাণ ফাইবার যোগ হতে পারে।যাদের খাবারে আঁশের পরিমাণ কম,
তাদের জন্য ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য ও বাদামের পাশাপাশি কিসমিসও একটি বিকল্প
হতে পারে।
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃকোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক হতে পারেঃ
কিসমিসে দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয়-দুই ধরনের খাদ্যআঁশই থাকে। খাদ্যআঁশ অন্ত্রের
স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং মলকে সহজে বের হতে সাহায্য করতে পারে।তবে
কোষ্ঠকাঠিন্য কমানোর জন্য শুধু কিসমিস খাওয়াই যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত পানি পান,
নিয়মিত হাঁটা এবং শাকসবজি ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার খাওয়াও প্রয়োজন।
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃশরীরে আয়রন সরবরাহে সাহায্য করেঃ
কিসমিসে কিছু পরিমাণ আয়রন রয়েছে। আয়রন শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ
একটি খনিজ। হিমোগ্লোবিন শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে।তবে আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতা থাকলে শুধু কিসমিসের ওপর
নির্ভর করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা
গ্রহণ করা উচিত।
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃশরীরে পটাশিয়াম সরবরাহ করেঃ
পটাশিয়াম শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ। এটি স্বাভাবিক পেশি ও স্নায়ুর কার্যক্রম
এবং শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।কিসমিসে পটাশিয়াম থাকার কারণে
এটি দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পটাশিয়ামের একটি উৎস হিসেবে যোগ করা যেতে পারে।
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃঅ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করতে পারেঃ
কিসমিসে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও উদ্ভিজ্জ যৌগ পাওয়া যায়।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে
সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি,
বাদাম ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাবারের সঙ্গে কিসমিস রাখলে শরীর বিভিন্ন ধরনের উপকারী
উদ্ভিজ্জ যৌগ পেতে পারে।
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃহৃদ্স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারেঃ
কিসমিসে পটাশিয়াম, খাদ্যআঁশ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান
রয়েছে। তাই পরিমিত কিসমিস একটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে
পারে।তবে কিসমিস একাই হৃদ্রোগ প্রতিরোধ করে-এমন দাবি করা ঠিক নয়। হৃদ্স্বাস্থ্য
ভালো রাখতে সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান এড়িয়ে
চলা গুরুত্বপূর্ণ।
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃহাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিঃ
কিসমিসে অল্প পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও বোরনসহ কিছু খনিজ পাওয়া যায়। এসব পুষ্টি
উপাদান শরীরের স্বাভাবিক হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।তবে হাড়
শক্ত রাখার জন্য শুধু কিসমিসের ওপর নির্ভর করা যাবে না। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার,
ডাল, শাকসবজি, বাদাম এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা প্রয়োজন।
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃস্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস হিসেবে ভালো বিকল্পঃ
ক্ষুধা লাগলে অনেকে অতিরিক্ত মিষ্টি, বিস্কুট বা চিপসের মতো খাবার খান। এর
পরিবর্তে অল্প পরিমাণ কিসমিস, বাদাম ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার স্ন্যাকস
হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।কিসমিস সহজে বহন করা যায় এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করাও
তুলনামূলক সহজ। তাই কর্মক্ষেত্র, ভ্রমণ বা ব্যস্ত দিনের জন্য এটি সুবিধাজনক খাবার
হতে পারে।
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃওজন বাড়ানোর খাদ্যতালিকায় ব্যবহার করাঃ
যারা স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন বাড়াতে চান, তাদের খাদ্যতালিকায় কিসমিস যোগ করা যেতে
পারে। কারণ শুকনো ফল হিসেবে কিসমিসে অল্প পরিমাণ খাবারে তুলনামূলক বেশি ক্যালরি
পাওয়া যায়।কিসমিস দুধ, ওটস, দই, বাদাম বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে খাওয়া
যেতে পারে। তবে ওজন বাড়ানোর জন্য শুধু কিসমিসের ওপর নির্ভর না করে পর্যাপ্ত
প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট ও অন্যান্য পুষ্টি নিশ্চিত করা
জরুরি।
কিসমিসে কী কী পুষ্টি উপাদান রয়েছে?
কিসমিসে আঙুরের তুলনায় পানির পরিমাণ অনেক কম থাকায় এর পুষ্টি ও ক্যালরি ঘন হয়ে
যায়। এতে প্রধানত কার্বোহাইড্রেট ও প্রাকৃতিক চিনি থাকে। পাশাপাশি পাওয়া যায়
খাদ্যআঁশ, পটাশিয়াম, আয়রন, কপারসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান।এছাড়া কিসমিসে উদ্ভিজ্জ
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য ফাইটো-কেমিক্যাল রয়েছে, যা শরীরের কোষকে
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সকালে ভিজিয়ে কিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃ
সকালে খালি পেটে পানিতে ভিজিয়ে কিসমিস খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। অনেকে মনে করেন এতে
কিসমিসের পুষ্টিগুণ আরও বেড়ে যায়। বাস্তবে কিসমিস ভিজিয়ে খেলে এটি নরম হয় এবং
অনেকের জন্য খেতে ও হজম করতে সহজ হতে পারে।তবে ভিজিয়ে খেলে কিসমিসের সব পুষ্টিগুণ
বা উপকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
খালি পেটে কিসমিস খাওয়া কি ভালো?
সকালে খালি পেটে কিসমিস খাওয়ার নির্দিষ্ট অতিরিক্ত স্বাস্থ্য উপকারিতা সবার জন্য
প্রমাণিত নয়। কারও কাছে এটি আরামদায়ক হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে খালি পেটে
মিষ্টি খাবার খেলে অস্বস্তি হতে পারে।তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে
কিসমিস খাওয়ার সময় ঠিক করা ভালো। চাইলে নাশতার সঙ্গে বা অন্য খাবারের অংশ হিসেবেও
কিসমিস খেতে পারেন।
কিসমিস পুষ্টিকর হলেও এটি শুকনো ফল। ফলে এতে পানির পরিমাণ কম এবং চিনি ও ক্যালরি
তুলনামূলকভাবে বেশি ঘন থাকে। তাই একসঙ্গে অনেক কিসমিস খাওয়ার প্রয়োজন
নেই।সাধারণভাবে ছোট এক মুঠো পরিমাণ কিসমিস একটি ব্যবহারিক পরিবেশন হতে পারে। তবে
বয়স, দৈনিক ক্যালরির প্রয়োজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য
পরিস্থিতির ওপর উপযুক্ত পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
কিসমিস খাওয়ার সঠিক উপায়ঃ
কিসমিস বিভিন্নভাবে খাদ্যতালিকায় যোগ করা যায়। যেমন-
সকালে অল্প পরিমাণ ভিজিয়ে খেতে পারেন।
ওটস বা পোরিজের সঙ্গে যোগ করতে পারেন।
দইয়ের সঙ্গে কিসমিস খেতে পারেন।
বাদাম ও অন্যান্য শুকনো ফলের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে পারেন।
ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবারে কিসমিস ব্যবহার করতে পারেন।
নাশতার অংশ হিসেবে অল্প পরিমাণ খেতে পারেন।
কিসমিসের সঙ্গে কোন খাবার খাওয়া যায়?
কিসমিসের সঙ্গে বাদাম, কাজু, আখরোট, দুধ, দই বা ওটস খাওয়া যায়। এতে নাশতা বা
স্ন্যাকস আরও পুষ্টিকর হতে পারে।তবে কিসমিসের সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার যোগ
করলে মোট চিনি ও ক্যালরি বেড়ে যেতে পারে। তাই খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখা
গুরুত্বপূর্ণ।
কিসমিস কি ওজন বাড়ায়?
কিসমিসে ক্যালরি ও প্রাকৃতিক চিনি রয়েছে। তাই বেশি পরিমাণে খেলে মোট ক্যালরি
গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন বাড়ানোর খাদ্যতালিকায় পরিমিত কিসমিস
রাখা যেতে পারে।
কিসমিস কি কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়?
কিসমিসে খাদ্যআঁশ রয়েছে, যা অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক
হতে পারে।
রাতে কিসমিস ভিজিয়ে সকালে খাওয়া যায়ঃ
কিসমিস রাতে পানিতে ভিজিয়ে সকালে খাওয়া যায়। এতে কিসমিস নরম হয়ে যায় এবং অনেকের
কাছে খেতে সুবিধা হয়। তবে ভিজিয়ে খেলেই অতিরিক্ত কোনো বিশেষ উপকার পাওয়া যাবে-এমন
প্রমাণ নেই।
শেষ কথাঃকিসমিস খাওয়ার উপকারিতাঃ
কিসমিস খাওয়ার উপকারিতা মূলত এর পুষ্টিগুণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে খাদ্যআঁশ,
পটাশিয়াম, আয়রন এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ নানা পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
পরিমিত কিসমিস শরীরে শক্তি জোগাতে, খাদ্যআঁশের চাহিদা পূরণে এবং স্বাস্থ্যকর
খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
টিপস ল্যাব ২৪ ব্লগের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url